শিল্প কথন

Ruksana akhter 3 weeks ago Views:21

মাটির শিল্প


দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারে বাউফলের মৃৎ শিল্প



পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পটুয়াখালীর বাউফলের মৃৎ শিল্প দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারে রপ্তানী করা হচ্ছে। বিগত কয়েক বছর ধরে ইউরোপ, আমেরিকার ও অষ্ট্রেলিয়ার বেশ কয়েকটি বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্য।

বাউফল উপজেলার মদনপুরা ও কনকদিয়া ইউনিয়নের পালপাড়া পরিদর্শনকালে জানা যায়, বর্তমানে মহা ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎ শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকরা। চোখে পড়েছে মাটির তৈরী বাহারি সব তৈজসপত্র এবং শোনা যাচ্ছে নানা রং-বেরংয়ের খেলনার টুং টাং শব্দ। প্রতিযোগিতা চলছে দ্রুত সরবরাহের। পণ্য ফিনিশিং শেষে চলছে প্যাকেজিং। কাগুজিরপুল ব্রিজের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে লোড করা হচ্ছে মাটির তৈরি পণ্য ভর্তি ঝুড়ি। বাজার ধরতে গাড়িগুলো যাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। বাঙ্গালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে প্রায় মাসখানেক ধরে মৃৎ শিল্পীরা তাদের স্নেহমাখা হাতের মায়াবী কারুকার্যে কাদামাটি দিয়ে বাহারি এসব মাটির পণ্য তৈরী করে আসছেন। মাটির পণ্যগুলো বাহারি ডিজাইনে তৈরী, রোদে শুকানো, পোড়ানো সবশেষে তুলির আচড়ে রঙ করা নিয়ে ব্যস্ত সবাই।

বাউফলে আধুনিক মাটির পণ্য তৈরীর দিকপাল, বিভিন্ন সংস্থা থেকে জাতীয় পর্যায়ে একাধিক পুরষ্কার প্রাপ্ত বিশ্বেশ্বর পাল বলেন, এখানকার মাটির পণ্য দেশ এবং বিদেশে নন্দিত। এ সকল পণ্য বিদেশে রপ্তানির জন্য আড়ং, কোর দি জুট ওয়ার্কস, ঢাকা হ্যান্ডিক্রাফটসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

তিনি বলেন, প্লাষ্টিক পণ্যের প্রভাবে বংশানুক্রমিকভাবে চলে আসা এই পেশা যখন বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তখন আমরা আধুনিক ডিজাইনের পণ্য তৈরির জন্য কৌশল অবলম্বন করি। আশির দশকে ঢাকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বাউফলের মাটির পণ্যের মান দেখানো হয়। ওই সময় আড়ং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়। তারা বাউফলে তৈরী মাটির পণ্য দেখে মুগ্ধ হন। সেই থেকেই তাদের সহযোগিতায় এ শিল্পে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করে। এরপর ঢাকা হ্যান্ডিক্রাফট নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলে বাউফলে তৈরী নানা ধরনের মাটির পণ্য সরবরাহ শুরু হয়।


তিনি আরও বলেন, আমরা কঠোর পরিশ্রম ও মননশীলতা দিয়ে বাউফলের মাটির পণ্যকে বিশ্বমানের আধুনিক পণ্যে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছি এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা গর্বের অংশীদার হয়েছেন। বর্তমানে বাউফলের মাটির তৈরী নানা পণ্য এশিয়া মহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্বেশ্বর পাল বলেন, আড়ং, কোর দি জুট ওয়ার্কস এবং ঢাকা হ্যান্ডিক্রাফটসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাউফলের এসব পণ্য দখল করে নিয়েছে কানাডা, আমেরিকা, গ্রেট বৃটেন, নেদারল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া এবং জাপানের মত শিল্পোন্নত দেশের বাজার। স্বীকৃতিও মিলেছে কাজের। মৃৎ শিল্পের ওপর কাজ করা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সম্মাননাসহ আজীবন সম্মাননাও পেয়েছি।

তিনি বলেন, সারা বছরই এসব পণ্যের চাহিদা থাকলেও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ সময় বাউফল এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামীণ মেলা উপলক্ষে পুতুল, ঘোড়া, হাতি, টিয়াসহ রং-বেরংয়ের নানা মাটির তৈরী খেলনারও ব্যাপক চাহিদা থাকে। তাই এ সময় নিয়মিত মৃৎ শিল্পী ছাড়াও অতিরিক্ত সহায়ক শিল্পী কাজে লাগানো হয়। এ সময় সৃষ্টি হয় বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং কর্মচাঞ্চল্য।

বাউফল পৌর সভার এক নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও বাউফলের একটি মৃৎ শিল্প কারখানার মালিক শংকর পাল জানান, প্রতি বছরই পণ্যের ডিজাইনে পরির্বতন আসে। ঢাকার বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নতুন ডিজাইন করে তাদের চাহিদাপত্র দেন। সে অনুযায়ী নতুন নতুন ডিজাইনের পণ্য তৈরী হয়।

তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর সবগুলো মাটির পণ্যেই নতুনত্ব এসেছে।
অপর এক গুণী মৃৎ শিল্পী শ্যামল পাল বলেন, এ বছর ডিনার সেটে থাকছে প্লেট, গ্লাস, মগ, কারিবল, জগ, লবনদানি, সানকি (বাসন), কাপপিরিচ ও তরকারির বাটি। এছাড়াও নতুন ডিজাইনে তৈরী করা হয়েছে স্যুপ সেট। অন্যান্য পণ্যের মধ্যে নতুন ডিজাইনের কয়েলদানি, মোমদানি, ঘটি, ফুলদানি ও নানা ধরণের খেলনা ক্রেতাদের আলাদা ভাবে আকৃষ্ট করবে। ডিনার সেট ছাড়াও আলাদা বিক্রির জন্য তৈরী করা হয়েছে মাটির প্লেট, গ্লাস, জগ, মগ, ইত্যাদি। রাসায়নিক কোন পদার্থের ছোঁয়া ছাড়াই তৈরী করা হয়েছে মাটির ওইসব পণ্য।
তিনি বলেন, পণ্যের গায়ে রঙ করা হয় পাহাড়ি গাছের রস দিয়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শিল্পীরা সবাই শেষ সময়ের ব্যস্ততায় দৌঁড়ঝাপ করছেন। পরিবারের সকল সদস্যসহ বাড়তি শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছে প্যাকেজিং করে বাজারজাতকরণের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য।
মৃৎ শিল্প কারখানার মালিক শিল্পী বরুন পাল বলেন, এক সময় বাউফলের পাল পাড়ায় জালের কাঠি, পুতুল, কলস, বাচ্চাদের খেলনা, রসের হাঁড়িসহ গ্রামবাংলার ঘরে ব্যবহার্য নানা ধরনের মাটির সামগ্রী তৈরী হত। ক্রমান্বয়ে একই কাঁচামালে তৈরী হতে থাকে মোমদানি, অ্যাষ্ট্রে, ফুলদানি এবং পায়ের গোড়ালি ঘষোনি (ঝামা)। বৈশাখের চাহিদা ছাড়াও ডিনার সেট, মোমদানি, অ্যাষ্ট্রে, ফুলদানি, কয়েল দানি, টি সেট, হুক্কা, ভর্তার বাটি, ল্যাম্পসেট, মাটির মালা, ব্রেসলেট ও কানের দুলসহ আর্কষণীয় মাটির শো-পিস তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বৈশাখে অতিরিক্ত অর্ডার থাকে। আধুনিক ডিজাইনের এসব মাটির পণ্য তৈরি করে অনেক পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে। সন্তানরা লেখাপড়া করছে। তবে প্রতিযোগিতার বাজারে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ ব্যাংক ঋণ প্রয়োজন। সরকার যদি এক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা করে তবে এই শিল্প দেশের আর্থিক খাতকে আরো শক্তিশালী করতে অবদান রাখতে পারবে বলে তিনি মনে করেন।



Comment


Recent Post