আত্মকাহিনী

Ruksana akhter 3 months ago Views:82

মৃত্যুর আত্মকাহিনী


একটি মৃত্যুর আত্মকাহিনী!




ঘুম থেকে উঠার পর থেকে মাথাটা কেমন জানি ভার ভার ঠেকছে। বিমর্ষ লাগছে বেশ। অজু করার সময় মাথায় বেশি করে পানি ঢাললাম। মাথাব্যথা কমানোর জন্য। বাড়ির পাশেই মসজিদ। ফজরের নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়ে আসলাম। ফজর বাদে কোরআন শরীফ পড়া আমার অভ্যাস। আজও তার ব্যত্যয় ঘটলোনা। মসজিদ থেকে রুমে এসে পড়ার টেবিলে আল কোরআন নিয়ে বসলাম। আমি তেলাওয়াত করছি...

®তোমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও সালাত এবং সবরের মাধ্যমে। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সবরকারীদের সঙ্গে আছেন।
®যারা আল্লাহ তায়ালার পথে নিহত হয় তাদেরকে তোমরা মৃত বলোনা; বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা বুঝতে পারনা।
®আমি তোমাদিগকে কোন কিছুর ভয়,ক্ষুধা এবং ধন -সম্পদ,জীবন,ফলমূল ও ফসলাদির ক্ষতির মাধ্যমে অবশ্যই পরিক্ষা করে থাকি। আর আপনি ধৈর্যশীলদের শুভ সংবাদ দান করুন।
®এরাই হচ্ছে তারা যাদের উপর যখনই বিপদ পতিত হয় তখন তারা বলে,'নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই,এবং আমরা তার নিকটেই ফিরে যাব।'.....

মাথার ব্যথাটা বেশ কমেছে। এখন ভালো লাগছে। ফুরফুরে লাগছে। কোরআন পড়ার পর আমার এমনই হয়। মনে প্রশান্তি লাগে। কোরআন শরীফ বন্ধ করলাম। এমন সময় একটা ফোন এলো।
-আসসালামু আলাইকুম।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম। আব্দুল্লাহ বলছিলেন?
-জি আব্দুল্লাহ বলছিলাম।
-আমি রকমারি থেকে বলছিলাম। আপনি কয়েকটা বই অর্ডার করেছিলেন।
-জ্বি হ্যা! কোথা থেকে সংগ্রহ করতে পারি?
-আমি এখন আপনার হলের সামনে। একটু গেটে আসতে পারবেন।
-'শিট' মনে মনে বললাম। ' কিন্তু ভাই আমি তো হঠাৎ একটু বাড়িতে এসেছিলাম। মা অসুস্থ এজন্য।
-ও আচ্ছা,তো কবে আসবেন?
-কাল। কালই চলে আসবো।
-ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি। এটা আমার নাম্বার। আমি রকমারীর এই অঞ্চলের দায়িত্বে আছি। এসে ফোন দিয়েন। আমি বইগুলো দিয়ে যাব। 
-জ্বি ধন্যবাদ। আপনার নামটা একটু বলবেন কি ভাই?
-আমার নাম রহমত।
-আচ্ছা। আমি আপনাকে ফোন দিব।

রহমত ভাই ফোন রেখে দিলো। আমি পাশের রুমে গেলাম। মাকে দেখতে। 
ও! আপনাদের তো বলাই হয়নি আমার মায়ের কি অবস্থা এখন। আমরা তিনভাই বোনে। আমি সবার বড়। তারপরে বোনটা। বোন ক্লাস টেনে পড়ে। সবার শেষে ছোট ভাইটি। ও ক্লাস ফোরে পড়ে।

মায়ের অবস্থা বলতে গেলে আগের চেয়ে ভালো। আমি যেবছর এডমিশন টেষ্ট দিই সে বছরই আব্বা মার যান। আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে মায়ের প্রেশার বাড়তে থাকতে। হাপানি সমস্যা। কখনো সখনো মনে হয় এই যাবেন যাবেন। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে ফিরে আসে আমার মা।

আমার খুব খারাপ লাগে। মায়ের ওই অবস্থা আমি দেখতে পারিনা। ছোটবোন ফোনে সর্বশেষ মায়ের অবস্থা যখন বর্ননা করছিল আমি তখন কেদে দিয়েছিলাম প্রায়। তখন আর দেরী করলাম না। বাড়ি আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। দুটো টিউশনি করাই। কিন্তু এখন মাসের প্রায় শেষ। কোন টাকাও ছিলোনা। শেষমেষ গনরুমের বন্ধু ফয়সাল কিছু টাকা দিয়েছিলো। তাতেই আমার বাড়ি আসা।

আমি মায়ের কপালে হাত রাখলাম। মা শুয়ে আছে। দিন দিন মায়ের হাড় বেরিয়ে যাচ্ছে। খাওয়াদাওয়া ঠিকঠাকভাবে করেননা। আমি মাকে বললাম,' কোন টেনশন করোনা,যে ওষুধ ডাক্তার দিয়েছে নিয়মিত খাও। এ মাসের টাকা পেলে আমি পাঠিয়ে দিব। ইনশাআল্লাহ সুস্হ্য হয়ে যাবা দ্রুত।' 

মা আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো শুধু। কোন কথা বললো না। খেয়াল করলাম মায়ের চোখ চিকচিক করছে। ছোটভাইকে  এবার পড়াতে বসলাম। এ কদিন সকালের দিকে আমি তাকে পড়িয়েছি। স্কুলে যাবার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত। একটু পরে আমি বের হবো শুনে ছোট ভাই 'না না' করতে লাগলো। আমি জানি এটা তার আবদার। আমার আবার সামনে টিউটোরিয়াল এক্সাম। পড়াশোনা করা দরকার। ফার্স্ট ইয়ারে গনরুমে থাকাতে ভালো রেজাল্ট করতে পারেনি। এবার করতে হবে। চারমাস পরই ফাইনাল পরীক্ষা।

ছোটবোন খাবার রেডি করলো। মাকে সাথে নিয়ে সবাই একসাথে খেলাম। ছোটবোনকে বললাম,' মাকে দেখে রাখিস'। ছোটবোন আমার খু্ব ভালো। ওর উপর আমার বিশ্বাস আছে।

বের হতে হতে দশটা বেজে গেলো। যশোর থেকে ঢাকা যেতে মিনিমাম পাঁচ ঘন্টা লাগবে। জ্যাম হলে আরো বেশি। মাকে এভাবে রেখে ক্যাম্পাসে যেতে মন সায় দিলো না। এমনিতেই অন্যরকম একটা আকর্ষন কাজ করে বাড়ির প্রতি। আব্বু মারা যাবার পর থেকে আমিও বেশ আনমনা হয়ে গেছি। আব্বু মারা যাবার বছরে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া বলা যায় আল্লাহর 'বিশেষ রহমত'।

আমি গাড়িতে উঠলাম। মা বিছানা থেকে উঠতে পারেনি। ছোটভাই ততক্ষনে স্কুলে চলে গিয়েছে। বোনটা আমাকে বিদায় দিতে কিছুদূর এগিয়ে এলো। আমি বিদায় নিলাম।
মাকে নিয়ে আমি খুব ভাবছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করছি,' হে আল্লাহ! তুমি আমার মাকে সুস্থ করে দাও!'

গাড়ি চলছে তার নিজস্ব গতিতে। আমি সবসময় চেষ্টা জানালার পাশে বসতে। আল্লাহর সৃষ্টিরাজি দেখতে আমার বেশ ভালো লাগে। আল্লাহর প্রতি আমি শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। দুনিয়াটা এতো সুন্দর! সবাই যদি সুন্দর এ দুনিয়ার সৃষ্টকর্তার দিকে রুজু হতো। কি সুন্দরই না হতো! না, আজ আর দৌলতদিয়া ঘাট জ্যাম বাধেনি। আলহামদুলিল্লাহ! বাস ক্যাম্পাসের সামনে এসে দাড়ালো। আমি ক্যাম্পাসের মধ্যে ঢুকে গেলাম। আমাদের ক্যাম্পাসটাও কতো সুন্দর। হলের সামনে আসলাম আমি। সিড়ি ভেঙে পাচতলা উঠে গেলাম। ৫১২। এটা আমার রুম। এই রুমে নতুন উঠেছি। একদম নতুন। বাড়ি যাবার আগের দিন। আগে তিনতলায় থাকতাম। রুমে যারা থাকেন সবাই আমার ইমেডিয়েট সিনিয়র। রাজনৈতিক বড় ভাইদের সিদ্ধান্তেই আমার এই রুমে আসা।

রুমে এসে দেখলাম তিনজন বড়ভাই যে যার তালে ব্যস্ত। একজন সিগারেট টানছে। একজন ঘুমুচ্ছে। জেগে থাকা দুজন বড়ভাইয়ের সাথে হাত মিলালাম। কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করলাম। 

আমার মনেই ছিলোনা জোহরের নামাজ পড়া হয়নি। দ্রুত অজু করে জায়নামাজ বিছালাম রুমেই। যে ভাই বিড়ি ধরেয়েছিলো সে আমাকে থামতে বললো। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আসতে বললো। আমি তাই করলাম।

পরদিন আমি রহমত ভাইকে ফোন দিলাম। রহমত ভাই হলের সামনে এলো। যাবার সময় বন্ধু ফয়সালের কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা ধার করেছিলাম। তার কিছু টাকা এখনও আছে। রকমারীতে বই অর্ডার করেছিলাম বেশ কদিন আগে। রহমত ভাই এসে আমার হাতে তিনটি বই ধরিয়ে দিলো। 
১/প্রত্যাবর্তন ২/হে যুবক শোন ৩/ আল কোরআনের বিষয়ভিত্তিক অভিধান।

আমার এই স্বভাবটা বহু পুরনো। সবসময় বইয়ের নেশা কাজ করে। ভালো বই কিনতে দ্বিধা করিনা। তবে ইসলামী ধাচের বই বেশি কিনি। কারন ওরকম বই থেকে অনেক কিছুই আমি শিখি,শিখা সম্ভব হয়। উপরের তিনটি বইও অনেক ভালো মানের শুনেছি। ঝটপট তাই রকমারী থেকে কিনে আনা। 

আমি জানি হাতের টাকা দিয়ে দিলে মাসের বাকী চারটে দিন অনেক কষ্টে যাবে। আজ থেকে আবার টিউশনি শুরু করতে হবে। তারা হয়তো দু চারদিনের মধ্যেই টাকা দিবে। আমি হিসাব করে ফেললাম,টিউশনির টাকা পেলে  বাড়িতে টাকা পাঠানো এবং ধার শোধ দেবার পর কাছে আর কতো থাকবে!  বেশ টানাটানি হবে। আল্লাহ ভরসা! আল্লাহ আমার উত্তম সাহায্যকারী।

আজ দুই তারিখ। টিউশনির টাকা পাবো পাবো করে এখনো পাইনি। ওদিকে মায়ের আবার টাকা দিতে হবে। আমারও চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। মায়ের সাথে সকাল দুপুর কথা হয়। মোবাইলে মা কখনো বলিনি,' আমি অসুস্থ'। এজন্যই বোনের কাছ থেকে শুনে নিতে হয়।

একটু আগে টিউশনি থেকে আসলাম। প্রচন্ড গরমে হাপিতেশ অবস্থা। ফ্যান ছেড়ে দিলাম ফুল স্পীডে। রুমে গতকাল ছোটখাটো পার্টি হয়েছিলো। পার্টি না বলে গাজা আর মদের আসর বলা যায়। রুমের দুজন বড় ভাই এখনও ঘুমুচ্ছে। সন্ধ্যার সময় এমন ঘুম বেখাপ্পা লাগছে সত্যি। আরেকজন বড়ভাই গাজা নিয়ে বসে আছে। উনি আবার রাজনৈতিক বড়ভাই। উনার নাম সুজন।

যথারীতি মাগরিবের সুমহান আজান পড়লো। আজ অজু করে নামাজ পড়ে আবার রুমে আসলাম। 

সারাক্ষন গাজা টানে। সুজন ভাই আমাকে ডেকে হলের ছাদে নিয়ে গেলো। আমাকে বললো,আমার সাথে কোন জঙ্গি গোষ্ঠীর কানেকশন আছে কি না! আমি তার প্রশ্ন শুনে আকাশ থেকে পড়লাম। হতবাক হয়ে গেলাম আমি।তিনি আমাকে জেরা করতেই থাকলেন। বের করতে লাগলেন আমার সাথে সত্যি সত্যি কোন জঙ্গির সম্পর্ক আছে কি না।

সুজন ভাই তার রাজনৈতিক সমমনা আরো দুজনকে ফোন দিলেন। তারা এলো। সুজন ভাই তাদেরকে বললো, এ ছেলের সাথে জঙ্গিদের সংশ্লিষ্ট আছে। এর টেবিলের উপর 'জিহাদী বই' পাওয়া গেছে।

পলিটিক্যাল বড় ভাইরা এবার আমাকে ফাপর দিতে লাগলো। আমি পড়লাম মহা মসিবদে। বললাম,'দেখেন ভাই,আমার সাথে কোন জঙ্গি গোষ্ঠীর সম্পর্ক নেই। মুসলমান বলে ইসলামী বই পড়ে থাকি। সুজন ভাই আমার টেবিলের উপর থেকে একটা বই নিয়ে আসলো। বইটির নাম 'জিহাদের হাকিকত'। অন্যান্য পলিটিকাল ভাইয়েরা এবার নিশ্চিত হলো আমার সাথে নিশ্চয় কোন জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পর্ক আছে। আমি যতই তাদেরকে বোঝাতে চাচ্ছি যে আমার সাথে কারো এরুপ সম্পর্ক নেই ততই তারা তেড়ে আসছে। 

কিছুক্ষন পর আরো দুজন ভাই আসলো। তাদের দুজনের হাতেই রড। আমাকে স্বীকার করতেই হবে,আমার সাথে কোন জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পর্ক। তারা প্রথমে আমার জামার কলার টান মারলো। আমি ভয়ে আঁতকে উঠলাম। সত্যিই যদি আমাকে। আমি কাদো কাদো স্বরে বললাম যে আমার সাথে কারো এরুপ সম্পর্ক নেই। '

আমি কিছু ভাবার আগেই আমার মাথার উপরে একটা বাড়ি এসে পড়লো। এটা ছিলো রডের বাড়ি। আমি ব্যথায় কুকড়ে উঠে পড়ে গেলাম ছাদের উপর। তারা আমাকে উপপর্যুপরি লাথি মারতে থাকলো।

আমি রক্তাক্ত হয়ে গেলাম। আমার চোখের সামনে মায়ের দৃশ্য বার বার জেগে উঠছে। মায়ের জন্য টাকা পাঠাতে হবে। মা আমার খুব অসুস্থ। আমি যখন খুব করে চেচাচ্ছিলাম,লক্ষ্য করছিলাম আমার শব্দ বেশি দূর যাচ্ছেনা। আমি ছটফট করতে থাকলাম।

আমার উপর অত্যাচার এভাবে আরো কিছুক্ষন চললো। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে,আমি বুঝতে পারলাম। তারা আমাকে ছাদ থেকে ফেলে দেবার দৃঢ় স্বিদ্ধান্ত নিলো। 

তারা ছাদের চারপাশ জুড়ে যে সামান্য উচু দেয়াল সেখানে নিয়ে এলো। আমাকে উচু করে তারা শূন্যে ফেলে দিলো। আমি নিচে পড়ছি। আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। মৃত্যুর যন্ত্রনা বড় কঠিন। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য! আমার কোন ব্যথা লাগেনি! সত্যি বলছি! আমার কোন ব্যথা অনুভূত হচ্ছেনা! আমার অনুভব হলো,আমার জান চলে যাচ্ছে কিন্তু আমার নাকে কিসের সুঘ্রান আমি পাচ্ছি যা দুনিয়ার সকল সুঘ্রানকে হার মানাবে! জান্নাত থেকে একদল ফেরেশতা এসে আমার জান কবজ করে নিয়ে গেছে!

পরপর দুটো বিষয় আমাকে নাড়া দিলো। একটা সুখের, একটা দুখের।

সুখের খবর হলো-মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে জান্নাতের পাখি হবার সুযোগ দিচ্ছেন! রাব্বুল আলামিন আমার মৃত্যুকে ' শহীদি মৃত্যু' হিসাবে কবুর করে নিয়েছেন! আলহামদুলিল্লাহ!  এর চেয়ে সুখের সংবাদ আর কি হতে পারে! সবসময় আল্লাহর কাছে তো 'শহীদি মৃত্য'ই কামনা করতাম!

দুখের খবর হলো- ওরা আমার লাশটাকে হলের পেছনে বাগানের ঝোপে ফেলে দিয়ে গেছে। আমার প্যান্ট পরা ছিলো। পকেটে আমার ছোট ফোনটাও ছিলো। ওরা মনে হয় এটা দেখতে পায়নি। আমার ফোনে বার বার কল আসছে। মনে হয় আমার মা ফোন দিচ্ছে! আপনারা আশপামে কেউ আছেন কি? আপনাদের তেমন কষ্ট দিবনা। শুধু ফোনটা আমার কানে ধরিয়ে দিবেন। আমি অনেক চেষ্টা করলাম ফোনটা কানে উঠাতে কিন্তু পারলাম না। একবার,শুধু একবার আমার মায়ের সাথে কথা বলতে আমার মনটা খুব আকুপাকু করছে। মায়ের অসুস্থতা আবার বেড়েছে কিনা একবার জিজ্ঞেস করতাম!



Comment


Recent Post